আজকের আলোচনার বিষয়ঃ কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল। যা টেক্সটাইল টেস্টিং অ্যান্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোল ৩ এর স্ট্যাটিসটিক্যাল কোয়ালিটি কন্ট্রোল এর অন্তর্গত।

কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল (Quality control circle)
ভূমিকা (Introduction) :
কর্মস্থলে কর্মীদের মেধা ও সৃজনশীলতার ব্যবহার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তমূলক নের ব্যাপক অংশগ্রহণের ধারণা সমাজবিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তাদের শতাব্দী পুরনো ভাবনা । বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী র তার বিখ্যাত ওয়াই থিওরির অংশে কর্মীদের সম্বন্ধে নিম্নলিখিত মন্তব্য প্রকাশ করেছেন-
১. সাধারণ কর্মীরা কাজকে ক্রীড়া, বিনোদন ও অবসরের মতই স্বাভাবিক ও আনন্দদায়ক মনে করে।
২। সঠিক পরিবেশে মানুষ উচ্চাকাঙ্ক্ষী হয়।
৩। একজন গড়পড়তা কর্মীর অসামান্য সম্ভাবনা ও সামর্থ্য থাকে যা সঠিক পরিবেশে স্ফুরিত হতে পারে।
৪। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের কাজ হল সঠিক কর্ম-পরিবেশ তৈরি করা যাতে কর্মীরা তাদের সর্বোচ্চ মো সৃজনশীলতা প্রদর্শন করতে পারে এবং কোম্পানির সিদ্ধান্তমূলক কর্মে অংশগ্রহণ করতে পারে।
কর্মীরা যাতে তাদের মেধা ও সৃজনশীলতা প্রদর্শন করতে সক্ষম হয় এবং সিদ্ধান্তমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে সে বিষয়ে গত শতাব্দী হয়ে ব্যাপক চেষ্টা ও প্রয়াস গ্রহণ করা হয়। তবে জাপানিরা এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। উনবিংশ শতকের ষাটের দশকে তারা কোয়া-লিটি কন্ট্রোল সার্কেল নামে একটা পদ্ধতি বের করে, যা কর্মীদের মেধা ও সৃজনশীলতা প্রয়োগে এবং কর্মীদের সিদ্ধান্তমূলক কাজে অংশগ্রহণে খুবই সহায়ক প্রমাণিত হয়।
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল (Quality control circle)
কোয়া-লিটি কন্ট্রোল সার্কেল হল একটি অপেক্ষাকৃত স্বাধীন/খেজা ভিত্তিতে গঠিত সমস্যা সমাধানকারী দল। একই সেকশনে একই ধরনের কাজে জড়িত কর্মীদের একটি ছোট দল এ সার্কেলের সাথে যুক্ত থাকে, যারা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মান এবং উৎপাদনশীলতা সম্পর্কিত সমস্যা চিহ্নিত করে এবং তা সমাধান করে। ফলে প্রতিষ্ঠানের পণ্যের গুণগত মান এবং উৎপাদনশীলতাই শুধু বৃদ্ধি পায় না, প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের আনুগত্য ও ভালোবাসাও বৃদ্ধি পায়।
এ সার্কেলে সাধারণত ৪ থেকে ১০ জন সদস্য থাকে, যারা সপ্তাহে একবার এক ঘণ্টার জন্য সভায় বসে কর্মস্থলের সমস্যা চিহ্নিত করে এবং সমস্যা সমাধানের পদক্ষেপ নেয়। এ দলে একজন নেতা থাকে, যার নেতৃত্বে কোয়া-লিটি কন্ট্রোল সার্কেলের যাবতীয় কাজকর্ম পরিচালিত হয়। সাধারণত সুপারভাইজারই এ দলের দলনেতা হন ।
কোয়া-লিটি কন্ট্রোল সার্কেলের কর্মকাণ্ড ও কার্যকারিতা দলনেতার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের গুণাবলির উপর বহুলাংশে নির্ভর করে। কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের বৈশিষ্ট্য (Features of quality control circle) : কোয়া-লিটি কন্ট্রোল সার্কেলের বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ-
১। কোয়া-লিটি কন্ট্রোল সার্কেল একটি সমস্যা সমাধানকারী দল।
২। কোয়া-লিটি কন্ট্রোল সার্কেল একটি স্বেচ্ছা ভিত্তিতে গঠিত দল
৩। কোয়া-লিটি কন্ট্রোল সার্কেলের সদস্যগণ একই কর্মস্থল থেকে আসে।
৪ সদস্যগণ তাদের কাজ ও সমস্যা সম্পর্কে ভালোই অবগত।
৫। তারা দলীয় সৃজনশীলতার ভিত্তিতে কাজ করে।
৬। তারা তাদের সমস্যা শনাক্তকরণ ও তার সমাধানের বিষয়ে স্বাধীন।
৭। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলকে বিশেষজ্ঞ সেবা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হয়।
৮। সমস্যা সমাধানের সমস্ত পদক্ষেপসমূহ সার্কেলের সদস্যরা নিয়ে থাকে
৯। তাদের কর্মস্থলের নিজস্ব সমস্যাসমূহই কোয়ালিটি সার্কেলের বিষয়
১০। সার্কেলের সদস্যরা অন্যের সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের কাজ (Function of quality control circle) :
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের কাজগুলো নিম্নরূপ-
১। সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধা করা।
২। পণ্যের গুণগত মানের ক্রমাগত উন্নয়ন ও সমাধান অনুধাবনের চেষ্টা করা।
৩। পণ্যের উৎপাদনশীলতার ক্রমাগত উন্নয়ন ও সমাধান খুঁজে বের করা।
৪। মেশিন, কর্মক্ষেত্র ও মেঝে (Floor) পরিষ্কার রাখা।
৫। খাবার ঘর, টয়লেট ইত্যাদি পরিষ্কার রাখা
৬। সহকর্মীদের উপরোক্ত কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করা।
৭। কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে সমস্যার যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করে।
৮। দলীয়ভাবে ধীশক্তি, মেধা ও সৃজনশীলতা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে।
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের কর্মপদ্ধতি (Work procedures of quality control circle)
১। কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল সপ্তাহে অন্তত একবার এক ঘণ্টার জন্য সভায় বসবে।
২। সার্কেল কর্মস্থলের যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য গ্রহণ করবে এবং সভায় উপস্থাপন করবে।
৩। তারা সমস্যা বিশ্লেষণ করবে, কারণসমূহ বাছাই করবে এবং সমাধান শনাক্ত করবে।
৪। তারা সমস্যা বিশ্লেষণপূর্বক সমাধানসমূহ উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট পেশ করবে।
৫। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করলে তারা সমাধান বাস্তবায়ন করবে।
৬। সমাধানের পর তারা পর্যবেক্ষণ ও পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে দেখবে।
৭। ভারা প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিবে যাতে পুনরায় সমস্যা দেখা না দেয়।
৮। সার্কেলের সদস্যরা সমাধানের প্রতিটি ধাপ নিজেরাই বাস্তবায়ন করে । ফলে তারা মেধা প্রয়োগের আসান ভোগ করে থাকে।
৯। তারা অন্যদেরকে তাদের কাজ ও সফলতা সম্বন্ধে তথ্যাদি প্রদান করে।

কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের সুবিধা (Benefits of quality control circle)
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল হল কর্মস্থলে কর্মীদের মেধা ও সৃজনশীলতা প্রয়োগের কৌশল, যাতে তারা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তমূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং ফলত প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। একটি প্রতিষ্ঠানে বহু কর্মীর মেধা ও সৃজনশীলতা যুক্ত হলে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠানের সৃজনশীলতা ও কার্যকারিতাও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল চালু করে একটি প্রতিষ্ঠান বহুভাবে উপকৃত হতে পারে।
১। বহু কর্মী পণ্যের গুণগত মান ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে তাদের মেধা ও সৃজনশীলতা প্রয়োগের
২। মেধা ও সৃজনশীলতা প্রয়োগে কর্মীরা সুযোগ পাওয়ায় তারা সম্মানিত বোধ করে।
৩। প্রতিষ্ঠানকে নিজের মত করে ভাবার অনুভূতি আসে সুযোগ পায় ।
৪। কর্মস্থলে নিজের মেধা প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধান করতে পারায় উদ্ভাসিত হয় ও সৃজনশীলতার আনন্দ পায়।
৫। ফলত কর্মীরা নিজের কাজে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওঠে শৃঙ্খলাপরায়ণ হয়, প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্য ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল সংগঠন (Organization of quality control circle) :
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল নিম্নোক্তভাবে সংগঠিত হয় :
১। কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের একটি দলে সাধারণত ৪ থেকে ১০ জন সদস্য থাকে
২। একই কর্মস্থল থেকে একটি সার্কেল গঠিত হয়।
৩। কর্মস্থলের স্বাভাবিক কর্ম-বিভাজন অনুযায়ী কোয়ালিটি সার্কেল গঠিত হওয়া উচিত ।
৪। প্রতিটি কোয়ালিটি সার্কেলের একজন দলনেতা থাকেন।
৫। সাধারণত সুপারভাইজার দলনেতা হয়ে থাকে।
৬। সার্কেলের সদস্যরা স্বেচ্ছা-ভিত্তিতে সদস্য হয়ে থাকে।
৭। দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মীরা সদস্য হলে ভালো হয়।
৮। বয়সে তরুণ কিন্তু দক্ষ কর্মীদের সদস্য হওয়া উচিত।
৯। আগ্রহী কর্মীদের সদস্য হওয়া উচিত।
১০ । তুলনামূলক শিক্ষিত কর্মীদের সদস্য করা উচিত।
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের সাংগঠনিক কাঠামো (Organization chart of quality control circles)
কোন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন সেকশন বা বিভাগের জন্য আলাদা আলাদা কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেল থাকতে পারে। নিয়ে কোয়ালিটি সার্কেলের সাংগঠনিক কাঠমো দেখানো হলঃ

কোন কারখানার নির্বাহী পরিচালক, মহা-ব্যবস্থাপক, কারিগরি ব্যবস্থাপক, বিভিন্ন বিভাগীয় প্রধানগণ নির্দেশনা কমিটির সদস্য হন। নির্দেশনা কমিটির প্রধান হল কারখানার প্রধান নির্বাহী।
স্টিয়ারিং কমিটি বা নির্দেশনা কমিটি সাধারণত নিম্নলিখিত কার্যাবলি সম্পাদন করেঃ
১। সার্কেল পরিচালনার জন্য পলিসি ও নীতিমালা নির্ধারণ করে।
২। সমন্বয়কারী বা কো-অর্ডিনেটর নিয়োগ করে।
৩। বিভিন্ন বিভাগে কোয়ালিটি সার্কেল গঠনে ভূমিকা পালন করে।
৪। সার্কেলের সকল সদস্যগণকে কর্মস্থলের সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান করার বিষয়ে প্রণোদিত ও উৎসাহিত করে।
৫। কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের অগ্রগতি দেখাশুনা করে।
৬। কর্মের স্বীকৃতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করে।
৭। কোয়ালিটি সার্কেলকে স্বেচ্ছাভিত্তিতে কাজ করতে সহায়তা করে
৮। কর্মীদের মটিভেশনের মান পর্যালোচনা করে।
৯। দলীয়ভাবে কাজ করার উৎসাহ জোগায়
১০। কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের কাজ করার প্রতিবন্ধকতা দূর করার ব্যবস্থা নেয়।
সমন্বয়কারী (Co-ordinator) :
কোয়ালিটি সার্কেলে একজন সমন্বয়কারী থাকে। কোয়ালিটি সার্কেল এবং পরিচালনা কমিটির মধ্যে সমন্বয় সাধন করাই তার প্রধান কাজ।
কো-অর্ডিনেটর নিম্নলিখিত কার্যাদি সম্পন্ন করেন-
১। স্টিয়ারিং কমিটি ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন।
২। কোয়ালিটি সার্কেলের সভায় উপস্থিত থেকে কার্যাদি পর্যবেক্ষণ করেন।
৩। কোয়ালিটি সার্কেলে সদস্যগণকে তাদের কাজে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগান।
৪। প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন যাতে সার্কেল যথাযথভাবে কাজ করে।
৫। কীভাবে একটি সমস্যাকে বিশ্লেষণ করে সমাধান করা যায় তা বুঝিয়ে দেন।
৬। সমস্যা ও সমাধানের বিষয়ে পরিসংখ্যানবিদের মত কাজ করেন ।
৭। কোয়ালিটি সার্কেলের কাজের প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে সহায়তা করেন।
দলনেতা (Leader) ঃ
কোয়ালিটি সার্কেলের কর্মকাণ্ড ও কার্যকারিতা বহুলাংশে দলনেতার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের গুণাবলির উপর নির্ভর করে। উক্ত দলনেতা নিম্নলিখিত কার্যাবলি সম্পন্ন করে থাকেন ঃ
১। সদস্যদের সৃজনশীলতা ও সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর ব্যবস্থা করা।
২। সদস্যরা যাতে রীতিমত কোয়ালিটি সার্কেলের সভায় অংশ নেয় তা নিশ্চিত করা।
৩। দলীয় ভিত্তিতে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তোলা ।
৪। দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ও সদ্ভাব বজায় রাখা।
৫। সদস্যরা যাতে কর্মস্থলের সমস্যা গ্রহণ করে তা বিশ্লেষণের জন্য মেধা প্রয়োগ করে তা নিশ্চিত করা।
৬। সময়মত সভা আহ্বান করা।
সদস্য (Members) :
কোয়ালিটি কন্ট্রোল সার্কেলের সদস্যগণ নিম্নলিখিত কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকেন :
১। কর্মস্থলের সমস্যা সমাধানের নিমিত্তে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।
২। সমস্যার বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করবেন।
৩। সমস্যার কারণসমূহ বিশ্লেষণ করে সমাধানে পৌঁছাবেন ।
8। সমস্যার সমাধান বাস্তবায়ন করবেন।
৫। সমস্যা যাতে পুনরায় দেখা না দেয় তা পর্যবেক্ষণ পূর্বক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিবেন ।
৬। সমস্যা সমাধানের জন্য তাদের মেধা ও সৃজনশীলতা কাজে লাগাবেন ।
৭। সৃজনশীলতা ও মেধা প্রয়োগের আনন্দ উপভোগ করবেন।