পোশাক তৈরির বিভিন্ন ধাপ ক্লাসটি বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের, ভোকেশনাল শিক্ষার,ফ্যাশন এন্ড ডিজাইন (১৯৭৪)।
পোশাক তৈরির বিভিন্ন ধাপ
বিভিন্ন ধরনের তন্তু যেমন তুলা, ফ্ল্যাক্স, রেশম, পশম, নাইলন, রেয়ন ইত্যাদি থেকে বস্ত্র উৎপাদন করা হয়। এই বসা থেকে তৈরি হয় পোশাক। কাটি হাতে বা মেশিনে বোনা হতে পারে কিংবা তাঁতের তৈরিও হতে পারে। পোশাকের জন্য নির্বাচিত কাপড়টির তৈরির পদ্ধতি বিভিন্নরকম হওয়ার জন্য কাপড়ের মাঝে কখনো কখনো ফাঁক থেকে যায়। পোশাক তৈরির আগে কাপড় ধুয়ে নিলে এই ফাঁকগুলো ঠিক হয়ে যায়।

যদি কাপড় না ধুয়ে বুননের ফাঁক সমৃদ্ধ কাপড় দিয়ে পোশাক প্রস্তুত করা হয় তবে তা দিয়ে তৈরি পোশাক ধোয়ার পর সংকুচিত হয়ে পরিধানের অনুপযোগী হয়ে যায়। তাই ছাঁটার আগে কাপড়গুলো প্রস্তুত করে নিলে পোশাক ছোট হওয়ার কোনো ভয় থাকে না। পোশাক ছাঁটার আগে সাধারণত তিনটি পদ্ধতিতে কাপড় প্রস্তুত করা হয়। এ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো—
১। সংকুচিত করা— যেসব কাপড় পানিতে ভেজানো যায় সেগুলো প্রথমে কয়েক ভাজ করে একটি পরিষ্কার গামলায় রেখে তার মধ্যে এমনভাবে পানি দিতে হবে যেন কাপড়টি ভালোভাবে ডুবে থাকে। এভাবে ৮/৯ ঘণ্টা রাখতে হবে এবং মাঝে মাঝে এপাশ ওপাশ করে দিতে হবে। তারপর পানি থেকে কাপড়টি ভুলে দু’হাতের তালুর মধ্যে রেখে চাপ দিয়ে পানি বের করে নিতে হবে।
এক্ষেত্রে কাপড়টি নিংড়ানো উচিত নয়। এরপর কাপড়টি ঝেড়ে শুকাতে দিতে হবে। যদি খুব তাড়াতাড়ি কাপড় সংকুচিত করার দরকার হয় তবে দু’টি পাত্র নিয়ে একটি পাত্রে গরম পানি এবং অপরটিতে ঠাণ্ডা পানি নিতে হবে। এবার কাপড়টি কয়েক ভাঁজে ভাঁজ করে একবার গরম পানিতে ও একবার ঠাণ্ডা পানিতে ৫-১০ মিনিট করে রাখতে হবে। এভাবে ৫/৬ বার করার পর কাপড়টি শুকাতে দিতে হবে।
কাপড় সংকুচিত করা
২। কাপড়ের ধার সোজা- করা ছাঁটার সময় কাপড়ের ধার সোজা না থাকলে পোশাক ছাঁটতে অসুবিধা হয়। এজন্য কাপড় ছাঁটার আগে ধারগুলো সোজা করে নিতে হয়। কাপড় পানিতে ভিজিয়ে সংকুচিত করার পর অল্প ভেজা থাকতেই একটি টেবিলের উপর সমান ভাবে বিছিয়ে দুই দিক টেনে সোজা করতে হয়। এছাড়া প্রয়োজনে কাপড়ের আড় দিকের একটি সুতা টেনে তুলে ঐ বরাবর কাপড় ছেঁটে ধার সোজা করা যায়।
কাপড়ের ধার সোজা করা
৩। ইস্ত্রি করা- কাপড় সংকুচিত করার পর অনেক সময়ই কাপড়ে ভাঁজ পড়ে। কাপড়ের এই কুঁচকানো ভাব দূর করার জন্য ইস্ত্রি করা প্রয়োজন। সবসময় কাপড়ের উল্টাদিকে লম্বালম্বিভাবে ইসিএ করতে হয় এবং বরের তন্তুর প্রকৃতি অনুসারে ইস্ত্রির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে নিতে হয়।
ছাপা বা রঙিন কাপড়ের রং পাকা কিনা তা কাপড় কাটার পূর্বেই পরীক্ষা করা উচিত। এক্ষেত্রে কাপড়ের কিনারা থেকে সামান্য কাপড় সাবান ও হালকা গরম পানি সহযোগে ধুয়ে রোদে শুকিয়ে আবার পুরা কাপড়ের সংগে মিলিয়ে দেখতে হবে। যদি কাপড়ের ছাপা উঠে যায় বা রং বিবর্ণ হয় তবে ১ গজ কাপড়ে একমুঠো লবণ দিয়ে পানিতে প্রায় ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখলে সংকুচিতকরণের পাশাপাশি রঙও পাকা হয় । কাজ পোশাক তৈরির জন্য বস্ত্র প্রস্তুতকরণের ধাপগুলো ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ কর।
মানানসই ফিটিং সমৃদ্ধ পোশাক তৈরির অন্যতম শর্ত হলো নকশা অনুযায়ী সঠিকভাবে পরিধানকারীর দেহের বিভিন্ন অংশের মাপ নেওয়া। পরিকল্পনা অনুসারে প্রথমে কাগজে মূল নকশা অংকন করা হয়। মাপ অনুসারে মূল নকশাকে পরে চূড়ান্ত নকশা বা প্যাটার্নে রূপ দান করা হয়। সর্বশেষে চূড়ান্ত নকশা অনুযায়ী কাপড় ছাঁটা ও সেলাই করে পোশাক তৈরি করা হয়।
পোশাকভেদে দেহের বিভিন্ন অংশের মাপ নেওয়া হয়। তাই কামিজ তৈরির সময় দেহের যেসব অংশের মাপ নেওয়া হয়, প্যান্ট তৈরির সময় সেসব অংশের মাপ নেওয়া হয় না।

যে কোনো পোশাকের পরিকল্পনা করা হোক না কেন মাপ নেওয়ার সময় মোটামুটিভাবে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি লক্ষ রাখা উচিত। যেমন-
১) একটি দৃঢ় অথচ নমনীয় ও সঠিক মাপার ফিতা ব্যবহার করতে হবে ।
২) মাপার সময় ফিতা সোজা করে ধরা উচিত ।
৩) কখনো নিজের মাপ নিজে নেওয়া ঠিক নয়। এতে মাপ ঠিক হয় না।
৪) মাপ নেওয়ার সময় সোজা হয়ে দাঁড়াতে হবে।
৫) কোমরের মাপ নেওয়ার সময় কোমরের স্বাভাবিক ভাঁজে আলগাভাবে ফিতা রেখে মাপ নিতে হবে।
৬) বুকের মাপ নেওয়ার সময় পূর্ণ শ্বাস গ্রহণ করে মাপ নিতে হবে।
৭) হিপের মাপ নেওয়ার সময় সবচেয়ে ফীত অংশের উপর ফিতা রেখে মাপ নিতে হবে।
৮) কোমর, বুক ও হিপের মাপ নেওয়ার সময় ফিতার নিচে চারটি আঙুল বিছিয়ে রাখতে হবে।
৯) হাতার ঘের, পলা, প্যান্টের মৌরী প্রভৃতি মাপ নেওয়ার সময় দু’টি আঙুল ফিতার নিচে রাখতে হবে।
১০) ফুল হাতার লম্বার মাপ নিতে হলে কব্জি থেকে ১.৯০ সে.মি. বেশি মাপ নিতে হবে।
১১) যে ব্যক্তির মাপ নেওয়া হবে তাকে একটি ফিটিং ড্রেস পরে নিতে হবে।
১২) প্রতিটি মাপ নেওয়ার সাথে সাথে তা খাতা বা নোট বুকে লিখে রাখতে হবে ।
পোশাক তৈরিতে শরীরের যেসব অংশের মাপ নিতে হয়, সেলাই-এর পরিভাষায় সেগুলোর বিশেষ নাম রয়েছে। এখানে শরীরের বিভিন্ন অংশের নাম উল্লেখ করে মাপ নেওয়ার পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো-
১। ফুল ঝুল বলতে পোশাকের লম্বা মাপকে বোঝায়। যেমন- কামিজের ক্ষেত্রে ২ নং চিত্রে ক-খ পর্যন্ত
–
পোশাকের ঝুলের মাপ। অন্যদিকে প্যান্ট বা সালোয়ারের ক্ষেত্রে ৩ নং চিত্রে গ-ঘ পর্যন্ত মাপ ।
২। পুট-মেরুদণ্ডের সবচেয়ে উঁচু হাড় থেকে কাঁধের শেষ প্রান্তের উঁচু হাড় পর্যন্ত মাপকে পুট বলে। ২ নং চিত্রে ক-গ পর্যন্ত মাপ ।
৩। গলা গলার মধ্যবিন্দুকে কেন্দ্র করে চারদিক বেষ্টন করে গলার মাপ নিতে হয়।
৪। হাতা কাঁধের শেষ প্রান্ত থেকে কব্জি বরাবর বা ইচ্ছামতো লম্বা মাপ।
৫। মুহরি বাহু বা কব্জির ঘেরের মাপকে মুহরি বলে। ২ নং চিত্রে চ-ও বাহুর ঘেরের মাপ।
৬। বুক -বুকের সবচেয়ে স্ফীত অংশের ঘেরের মাপ। ১ নং চিত্রে ক-খ বরাবর বেষ্টন করে যে মাপ।
দেহের বিভিন্ন অংশের মা
৭। কোমর কটি রেখার চারদিকের ঘেরের মাপ। ১ নং চিত্রে গ-ঘ বরাবর বেষ্টন করে যে মাপ ।
৮। হিপ কোমর থেকে ১৭.৭-২২.৮ সে.মি. নিচের সবচেয়ে স্ফীত অংশের ঘেরের মাপ। ১ নং চিত্রে – চ বরাবর বেষ্টন করে যে মাপ।
৯। মৌরী – ফুলপ্যান্ট, পায়জামা, সালোয়ার প্রভৃতি পোশাকের পায়ের ঘেরের মাপ। ৩ নং চিত্রে ঝঞ বিন্দু বরাবর বেষ্টন করে পছন্দমতো যে মাপ ।
কাপড় ছাঁটায় সৃজনশীলতা আনতে হলে কতকগুলো কৌশল অবলম্বন করতে হবে। এ কৌশলগুলো সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-
১। কাপড়টি টেবিলের বাইরে যেন ঝুলে না পড়ে সেজন্য সমান করে টেবিলের উপর বিছিয়ে নিতে হবে।
২। কাপড়ের সোজা দিক ভিতরে রেখে উল্টা দিকে সবগুলো প্যাটার্ন বিছিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে
প্রয়োজনীয় কাপড় আছে কিনা।
৩। কাপড় ছাঁটার সময় ভাঁজের কৌশল অবলম্বন করা দরকার। লম্বালম্বি দিক অনুযায়ী কাপড় ছাঁটলে পোশাকের সৌন্দর্য ও স্থায়িত্ব বাড়ে এবং কাপড়ের অপচয়ও রোধ করা যায়।
৪। কাপড় ছাঁটার সময় কাপড়ের ছাপার দিকে বিশেষ নজর রাখা উচিত। ছাপা কাপড়ের ফ্রক কাটতে হলে ড্রাফটগুলো এমনভাবে কাপড়ের উপর বিছাতে হবে যেন পোশাকের উপরের অংশের ছাপার সাথে নিচের অংশের ছাপার একটি সুন্দর মিল থাকে।
৫। পাড় সহ যেসব কাপড় পাওয়া যায় সেগুলো হাঁটার সময় পাড় যেন পোশাকের নিচের দিকে থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। অনেক সময় পাড়গুলো আলাদা ভাবে হেঁটে লাগালেও পোশাক দেখতে সুন্দর লাগে।
৬। কাপড়ের উপর সব ধরনের প্যাটার্ন বিছিয়ে আলপিন দিয়ে প্যাটার্নগুলো আটকিয়ে কাপড় ছাঁটতে হয়।
৭। কাপড় ছাঁটার সময় মাঝারি আকারের (১৭.৭৮ সেন্টিমিটার- ২০.৩২ সেন্টিমিটার) ধারালো কাঁচি ব্যবহার করতে হবে। কাপড় কখনো হাতে রেখে হাঁটা উচিত নয়। প্যাটার্ন ও কাপড় এক হাতে চাপ দিয়ে ধরে অন্য হাতে কাঁচি চালাতে হয়।
ড্রাফটের মাধ্যমে কাপড় ছেঁটে কীভাবে একটি পোশাক তৈরি করা যায় সে সম্পর্কে আমরা এখন জানার চেষ্টা করব। এ প্রসঙ্গে খুবই সাধারণ একটি পোশাক কিচেন এপ্রোনের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। রান্নাঘরে তেল, মশলার দাগ থেকে পরিধেয় পোশাক রক্ষার জন্য কিচেন এপ্রোন ব্যবহার করা হয়।
৮৬.৫ সে.মি./৩৪” লম্বা ও ৪৬ সে.মি./ ১৮” প্রস্থ বিশিষ্ট এপ্রোন তৈরি করতে হলে ১নং চিত্র অনুযায়ী ৯১.৪৪ সে.মি./৩৬” লম্বা এবং ২২.৮৬ সে.মি./৯” চওড়া বিশিষ্ট ক খ গ ঘ একটি আয়তাকার কাগজ নিতে হবে। এরপর ১নংচিত্রানুসারে ও থেকে চ পর্যন্ত বাঁকাভাবে হাতার সেইপ করতে হবে। এখন ৯১.৪৪ সে.মি./৩৬” লম্বা এবং ৪৬ সে.মি./ ১৮ চওড়া বিশিষ্ট একটি কাপড়কে লম্বালম্বিভাবে দুই ভাঁজ করে। কাগজের ড্রাফট ফেলে হাঁটার পর ভাঁজ খুললে ২নং চিত্রের মতো এপ্রোনের আকৃতি হবে।
কিচেন এপ্রোন
এবার এপ্রোনের প্রাপ্ত ধারগুলোতে হেম সেলাই দিলে উপরে ও নিচে প্রায় ৫ সে.মি./২” এর মতো কমে এপ্রোনটির মাপ ৮৬.৫ সে.মি./৩৪” তে দাঁড়াবে। সবশেষে এপ্রোনের কোমরের দুই দিকে দুইটি লম্বা ফিতা ও গলার উপরে বখেয়া সেলাই এর সাহায্যে চিত্রের ন্যায় ফিতা সংযোজন করলেই এপ্রোন তৈরি হয়ে যাবে।
পোশাক তৈরির বিভিন্ন ধাপ নিয়ে বিস্তারিত ঃ