আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়-স্পিনিং সিস্টেমের ক্রমোন্নতির বিবরণ
স্পিনিং সিস্টেমের ক্রমোন্নতির বিবরণ (Chronological Development of Spinning System)
:পৃথিবীতে কখন সুতা বয়ন অর্থাৎ স্পিনিং বা কাপড় বুনন শুরু হয়েছে, তা আজও ঐতিহাসিকগণ সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারেন নি। তবে যীশুখ্রিষ্টের জন্মের ৮০০০ বছর পূর্বে মানুষ সর্বপ্রথম নিলেন তন্তু দ্বারা সুতা বয়ন করে এবং কাপড় বুনন করে ব্যবহার করা শরু করে।
ঐতিহাসিকদের মতে তুলার ব্যবহার সর্বপ্রথম শুরু হয় ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল তথা আরব দেশগুলোতে। তবে সুইজ হ্রদের তীরবর্তী স্থানসমূহে খ্রিপূর্ব ৫০০০ সনে যে সুতা তৈরি ও কাপড় বোনার যন্ত্রপাতি আবিষ্কৃত হয়েছে তার দ্বারাই প্রমাণিত হয় যে, ঐ অঞ্চলের অধিবাসিগণ সে সময় সুতা তৈরি ও কাপড় বয়ন করতে পারত। আনুমানিক খ্রিপূর্ব ৩৫০০ সন হতে ভারতবর্ষে কার্পাসের ব্যবহার শুরু হয় বলে ইতিহাস সূত্রে জানা যায়।

ভূমধ্যসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে মিশর এ অঞ্চলের প্রথম স্থান দখল করে থাকবে। বর্তমানে মিশরীয় তুলা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তুলা বলে অভিহিত। ১৩০০ শতাব্দীর গোড়া থেকে বৃটেনে তুলার ব্যবহার শুরু হয়। ১৬০০ শতাব্দীর শেষের দিকে আমেরিকাতে তুলার ব্যবহার শুরু হয়।
যান্ত্রিকভাবে তুলা থেকে সুতা উৎপাদন শুরু হওয়ার পর থেকে আস্তে আস্তে সমগ্র বিশ্বে তুলার ব্যবহার শুরু হয়। যেহেতু আরবি শব্দ থেকে কটন শব্দের উৎপত্তি, কাজেই এটা মনে করা হয় যে, সর্বপ্রথম আরবগণই বাণিজ্যিকভাবে তুলা চাষ শুরু করেন এবং বাণিজ্যিক দ্রব্য হিসেবে বিশ্ব বাজারে তুলা ব্যবসার প্রচলন করেন। কয়েক শতাব্দী থেকে আরবরাই ছিল আন্তর্জাতিক তুলা ব্যবসায়ী জাতি ।
ঐতিহাসিক হিরোটেডাসের মতে, কার্পাস তুলার আদি জন্মস্থান হচ্ছে ভারতবর্ষ, পারস্য সাগর উপকূল ও আরবভূমি। হিরোটেডাসের মতে, যীশুখ্রিষ্টের জন্মের ১৫০০ বছর পূর্বে উপরিউক্ত এলাকাসমূহে তুলা চাষ ও ব্যবহার প্রচলন করে। কিন্তু চীন দেশ দাবি করে তারা যীশুখ্রিষ্টের জন্মের ২৩০০ বছর পূর্বে তুলার চাষ ও বয়ন মাধ্যম হিসেবে তুলা ব্যবহার করে আসছে ।

বাংলাদেশে আদিকাল থেকেই তুলার চাষ হয়ে আসছে, কিন্তু উক্ত তুলা দ্বারা কখনো বাণিজ্যিকভাবে সুতা প্রস্তুত হয় নি। কারণ উক্ত তুলার আঁশের দৈর্ঘ্য ছিল খুবই নগণ্য। হাত দ্বারা সুতা কেটে তখন কাপড় তৈরি হতো। পৃথিবী বিখ্যাত ঢাকার মসলিন শাড়ি সর্বপ্রথম ভারত উপমহাদেশে ঢাকার কাপাসিয়ায় উৎপাদিত তুলা থেকে তৈরি হতো।
মোগল আম মসলিনের যুগ হলেও বাংলাদেশের বয়ন শিল্পের বুনিয়াদ গড়া হয়েছিল হাজার হাজার বছর আগে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে দিকে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে আর্টস অব ইন্ডিয়া গ্রন্থে মসলিনকে সোলোয়ানের পর্দার মতো লাবণ্যময় ও মনুসংহিতার ।
আধুনিককালে আমেরিকা থেকে তুলা আঁশের কিছু বীজ এনে বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে তুলা চাষ হয়ে আসছে এবং যার আঁশের দৈর্ঘ্য মোটামুটি ভালো। ইন্ডাস্ট্রিতে এটা ব্যাপকভাবে ব্যবহারও শুরু হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে প্রাকৃতিক আঁশ তুলার পাশাপাশি কৃত্রিম আঁশের ব্যবহারও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু ব্যবহারের দিক থেকে তুলা দ্বারা তৈরি সুতার কাপড় খুবই স্বাস্থ্যসম্মত।
কাজেই কৃত্রিম আঁশের তৈরি পোশাক যতই না ব্যাপক ও দামে সস্তা হোক, তুলা আঁশের পোশাকের ব্যবহার ও চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। তুলার পানি ধারণ ক্ষমতা অর্থাৎ ময়েশ্চার রিগেইন ৮.৫% । কাজেই প্রাকৃতিক আঁশ তুলা দ্বারা তৈরি বস্ত্র ও পোশাক খুবই আরামদায়ক ও ত্বকে কোনো ক্ষতির কারণ হয় না।

ইত্যাদি কারণে বর্তমান বিশ্বে তুলা আঁশ থেকে ব্যবহৃত বস্ত্র সামগ্রীর চাহিদা প্রায় ৬৫% শতাংশ। ঐতিহাসিকদের মতে, কার্পাস তুলার বেশি অন্য কোনো বাণিজ্যিক বস্ত্র বাণিজ্য সম্ভার হিসেবে স্থান পায় নি। এককালে, কোনো জাতির সভ্যতার মাপকাঠি হিসেবে কার্পাস তুলার তৈরি সামগ্রীর মান ও পরিমাণকে গণ্য করা হতো ।